1
ഇന്ദുലേഖ
O. Chandu Menon · 1889 · বাংলা
প্রথম অধ্যায় প্রারম্ভ
চাতর মেনন: মাধব, এ কী দুঃসাহসিক কথা বলিলে? ছিঃ, এ মোটেই ভাল হয় নাই। তাঁহার যেমন ইচ্ছা, তিনি তেমনই করুন। কারণভরদের (পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ কর্তা) নিকট আমাদের নতিস্বীকার করিতেই হইবে, নয় কি? তোমার কথা একটু সীমা ছাড়াইয়া গিয়াছে।
মাধবন: কিছুমাত্র ছাড়াইয়া যায় নাই। কেহ যেন সিদ্ধান্ত জাহির না করে। তাঁহার ইচ্ছা না থাকিলে করিবার প্রয়োজন নাই। শিন্ননকে আমি সঙ্গে করিয়া লইয়া যাইব। আমিই তাহাকে পড়াইব।
কুম্মিণী আম্মা: না বাছা, সে আমাকে ছাড়িয়া থাকিতে পারিবে না, তুমি চাতরে বা গোপালনকে লইয়া গিয়া পড়াও। যাই হোক, কারণভরের মন তোমার উপর বিরক্ত হইয়াছে। আমাদের উপর তো পূর্ব হইতেই বিরক্ত, কিন্তু এ পর্যন্ত তোমার প্রতি তাঁহার বিশেষ স্নেহ ছিল।
মাধবন: বেশ, চাতরজ্যেষ্ঠ ও গোপালনকে এখন English পড়াইতে লইয়া গেলে বড়ই বিচিত্র হইবে।
এইরূপে তাঁহারা যখন কথোপকথন করিতেছিলেন, সেই সময় এক ভৃত্য আসিয়া সংবাদ দিল যে, মাধবকে তাহার মামা শঙ্করমেনন ডাকিতেছেন। মাধব তৎক্ষণাৎ তাহার মামার কক্ষে চলিয়া গেল।
এই কাহিনি আরও বিস্তার লাভ করিবার পূর্বে, এখানে মাধবের অবস্থা সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ বর্ণনা করা আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে।
মাধবের বয়স, পঞ্চুমেননের সহিত তাহার সম্বন্ধের (নায়ার-নম্বুদিরি সমাজের এক বিশেষ বৈবাহিক সম্বন্ধ) বিবরণ, এবং তাহার উত্তীর্ণ পরীক্ষাসমূহের কথা—এই সকল বিষয়ে ভূমিকায় বলা হইয়াছে। এখন এই ব্যক্তির বিষয়ে যাহা বলিবার আছে, তাহা সংক্ষেপে বলিতেছি।
মাধব এক অতি বুদ্ধিমান ও অতীব সুদর্শন যুবক। তাহার বুদ্ধিমত্তার বিশেষত্ব, English শিক্ষা আরম্ভ করা অবধি বি. এল. পাশ করা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে তাহার দ্বারা অর্জিত প্রশংসনীয় ও ক্রমোন্নতিশীল খ্যাতিই সুস্পষ্ট ও সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করিত। এমন একটিও পরীক্ষা ছিল না, যাহাতে মাধব প্রথমবারেই উত্তীর্ণ হইতে পারে নাই। এফ. এ. এবং বি. এ. উভয় পরীক্ষাতেই সে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়। বি. এ. পরীক্ষাতে তাহার দ্বিতীয় ভাষা ছিল সংস্কৃত। সংস্কৃতে মাধবের প্রথম শ্রেণীর ব্যুৎপত্তি ছিল। বি. এল. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করায় মাধব বহু পুরস্কারও লাভ করিয়াছিল। বিদ্যালয়ে মাধবকে যে সকল গুরু মহাশয়গণ শিক্ষা দিয়াছিলেন, তাঁহাদের সকলেরই এই প্রতীতি জন্মিয়াছিল যে, মাধবের অপেক্ষা অধিক সামর্থ্য ও যোগ্যতা সম্পন্ন কোনও ছাত্র তাঁহাদের কখনও ছিল না।
তাহার সহিত পরিচিত যে কোন ব্যক্তিই তাহাকে দেখিলে মনে করিত, যেন এই অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার আবাস হইবার জন্যই মাধবের দেহখানিও তদনুরূপভাবে সৃষ্ট হইয়াছে। কোনও পুরুষের গুণাগুণ বর্ণনা করিবার সময় তাহার শারীরিক সৌন্দর্যের বিশেষ বর্ণনা করা সাধারণত নিষ্প্রয়োজন। বুদ্ধিমত্তা, সামর্থ্য, শিক্ষা, পৌরুষ, বিনয় প্রভৃতি গুণের কথাই যথেষ্ট। তথাপি, মাধবের দেহকান্তি সম্বন্ধে দুই-চারি কথা না বলিলে এই কাহিনির পক্ষে তাহা অপর্যাপ্ত হইবে, আমার পাঠকগণ হয়ত এইরূপ মনে করিতে পারেন, এই আশঙ্কায় সংক্ষেপে কিছু বলিতেছি।
দেহখানি কাঞ্চনবর্ণ। প্রতিদিন শরীরের মঙ্গলের জন্য অনুষ্ঠিত ব্যায়ামের ফলে এই যৌবনকালে মাধবের দেহ অতীব মোহন হইয়া উঠিয়াছিল। প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্থূলতা বা কৃশতা কিছুই ছিল না; তাহার বাহু, বক্ষস্থল ও পদযুগল দেখিলে মনে হইত যেন স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত। তাহার দেহাকৃতি যথেষ্ট দীর্ঘ। মাধবের দেহ যদি পরিমাপ করিতে হয়, তবে অনায়াসেই তাহার জানু পর্যন্ত দীর্ঘ ও অতীব সুন্দর শিখা দ্বারা জানু পর্যন্ত নির্ভুলভাবে মাপা যায়। মাধবের মুখের কান্তি, পৌরুষশ্রী, প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পৃথক পৃথক সৌন্দর্য ও তাহাদের পারস্পরিক সামঞ্জস্য, এবং সর্বোপরি তাহার মুখ ও দেহের মিলিত যে শোভা, তাহা বিস্ময়কর বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। মাধবের পরিচিত সকল ইউরোপীয় ব্যক্তিই প্রথম দর্শনেই তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া তাহার অনুরাগী হইয়া উঠিত।
এইরূপে যৌবনারম্ভে তাহার শরীর ও খ্যাতি উভয়ই যে অতীব মনোহর, এই সর্বজনবিদিত ধারণাটি তাহার কাছে এক মহাভূষণস্বরূপ ছিল—এবং তাহা কখনও নষ্ট হইতে দেওয়া উচিত নয়, এই বিচারবশত, অথবা স্বভাবজাত বুদ্ধিগুণে, মাধব সাধারণ যুবকদের ন্যায় আঠারো বৎসর বয়স হইতে বিবাহ করিয়া গার্হস্থ্য জীবনে প্রবেশ করিবার মধ্যবর্তী সময়ে দুর্ভাগ্যবশত কখনও কখনও যে সকল কুকর্মে লিপ্ত হইতে দেখা যায়, তাহার কিছুতেই প্রবেশ করে নাই, এ কথা আমি নিশ্চিতরূপে বলিতে পারি। সেই কারণে, পূর্ণযৌবনে উপনীত হইলে মাধবের স্বাভাবিক দেহকান্তি, তেজ ও পৌরুষ দেখিবার মতোই ছিল।
মাধবের যে English-এ অসাধারণ নৈপুণ্য ছিল, সে কথা বোধহয় আর বলিবার প্রয়োজন নাই। লন টেনিস, ক্রিকেট প্রভৃতি English ধরনের ব্যায়াম ও বিনোদনেও মাধব অতীব নিপুণ ছিল। শৈশব হইতেই সে শিকারে অভ্যস্ত ছিল। সম্ভবত, এই অভ্যাস সে তাহার পিতা গোবিন্দপণিক্করের নিকট হইতে পাইয়াছিল—তিনি ছিলেন এক মস্ত শিকার-পাগল মানুষ। শিকারের প্রতি মাধবের আসক্তি অত্যন্ত প্রবল ছিল। দুই-তিন প্রকারের বিশেষ বন্দুক, দুই-তিনটি পিস্তল, রিভলভার—এই সকল সে যেখানেই যাইত, সঙ্গে লইয়া যাইত। তাহার বিনোদনের স্রোত অন্য পথে প্রবাহিত হইবার পূর্ব পর্যন্ত শিকারই ছিল মাধবের প্রধানতম আনন্দ।
ভৃত্য আসিয়া ডাকিলে মাধব তাহার মামার নিকট গিয়া দাঁড়াইল।
শঙ্কর মেনন: মাধব, এ কী কাণ্ড! বৃদ্ধ বয়সে কারণভরকে তুমি কী সব অপমানজনক কথা বলিয়াছ! তিনি যে তোমাকে English পড়াইলেন, এ কি তাহারই ফল? তোমার জন্য তিনি কত অর্থ ব্যয় করিয়াছেন!
মাধবন: মামাও যে এইরূপ মনে করিতেছেন, ইহা আমাদের দুর্ভাগ্য! সত্য কথা বলিতে আমি অন্যায়ভাবে কাহাকেও ভয় করি না। এই ধরনের দুষ্টামি আমি সহিতে পারি না। বড়মামা গায়ের ঘাম পায়ে ফেলিয়া যে একটি পয়সাও উপার্জন করিয়াছেন, তাহা ব্যয় করিতে আমি বলি নাই। পূর্বপুরুষেরা যাহা অর্জন করিয়াছেন এবং আমাদের উন্নতি ও মঙ্গলের জন্য তিনি যাহা নিজের কাছে রাখিয়াছেন, সেই অর্থ আমাদের ন্যায্য প্রয়োজনের জন্য ব্যয় করিতেই আমি বলিয়াছি। কুম্মিণী আম্মা ও তাঁহার সন্তানেরা এ বাড়ির ভৃত্য নহে, বড়মামা কেন তাঁহাদের প্রতি এত নির্দয় ব্যবহার করিতেছেন? তাঁহাদের দুই পুত্রকে English পড়ান নাই—কল্যাণীকুট্টিকেও ভাল করিয়া কিছুই পড়ান নাই। কী ভয়ানক কাজ করিতেছেন তিনি! এইরূপ দুষ্টামি কি করা যায়? এখন আবার ওই ছোট শিন্ননকেও একটা ষাঁড়ের বাছুরের মতো বড় করিবার মতলব আঁটিতেছেন। ইহাতে আমি সম্মত নহি। আমি তাহাকে লইয়া গিয়া পড়াইব।
শঙ্কর মেনন: বাহ্—বাহ্! বড়ই উত্তম! কী দিয়া তুমি তাহাকে পড়াইবে? মাসে পঞ্চাশটি টাকা মাত্র তো তুমি পাও? কী দিয়া পড়াইবে? মামার বিরাগভাজন হইলে অনেক বিপদ আসিতে পারে। এখনই গিয়া তাঁহার পায়ে পড়ো।
"মামার বিরাগভাজন হইলে অনেক বিপদ আসিতে পারে" এই কথা শুনিবামাত্র মাধব সর্বপ্রথমে ইন্দলেখার কথাই ভাবিল। সেই চিন্তা মনে আসিবার ক্ষণে মাধবের মুখে এক স্পষ্ট বিকারের ভাব ফুটিয়া উঠিল। কিন্তু পরক্ষণেই সে তাহা দমন করিল। কক্ষের মধ্যে ইতস্তত পায়চারি করিতে করিতে ঈষৎ মন্দহাস্যের সহিত মাধব উত্তর দিল।
মাধবন: আমি তাঁহাকে বিরক্ত করিতেছি কেন? ন্যায্য কথা বলিলে তিনি বিরক্ত হইবেন কেন? তাঁহার সেই অন্যায্য বিরাগকে আমি ভয় করি না।
শঙ্কর মেনন: ছিঃ! গুরুজনের অবমাননা করিও না।
মাধবন: কীসের গুরুজনের অবমাননা? আমি তো এই কথার অর্থই জানি না।
শঙ্কর মেনন: সেইটি না জানাই তো মুশকিল। আপ্পু! তুমি খানিক English পড়িয়া নিজেকে বিদ্বান মনে করিয়া আমাদের রীতিনীতি ও প্রথা ত্যাগ করিও না। বাছার খাওয়া হইয়াছে কি?
মাধবন: না। আমার মন বড়ই খারাপ। মা পায়েস লইয়া আসিতেছিলেন।
এই সময় পার্বতী আম্মা রুপার বাটিতে পায়েস হাতে লইয়া কক্ষে প্রবেশ করিলেন।
শঙ্কর মেনন: পার্বতী! শুনিলে তো বাছা কী সব বলিয়াছে?
পার্বতী আম্মা: শুনিয়াছি! মোটেই ভাল হয় নাই।
মাধবন: পায়েসটা এদিকে দাও।
দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়াই দুই চুমুক পায়েস পান করিয়া মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া হাসিতে হাসিতে।
মাধবন: কী মা, তুমিও আমার উপর বিরক্ত হইলে নাকি?
পার্বতী আম্মা: হইব না তো কী? তাহাতে সন্দেহ কী? জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও মামার যাহা পছন্দ নয়, তাহা আমারও পছন্দ নয়। আচ্ছা; এই পায়েসটুকু আগে শেষ করো। তাহার পর কথা বলা যাইবে। বেলা দ্বিপ্রহর হইয়া গেল। শিখাটা সবসময় এমন করিয়া ঝুলাইয়া রাখো কেন? এদিকে এসো; আমি বাঁধিয়া দিই। শিখা অর্ধেক খোলা হইয়া গিয়াছে।
মাধবন: মা, শিন্ননকে English পড়ানো আবশ্যক কি না? তুমিই বলো।
পার্বতী আম্মা: সে তো তোমার বড়মামা স্থির করিবেন, বাছা। আমি কী জানি? বড়মামাই তো তোমাকে পড়াইয়াছেন? তিনিই হয়তো তাহাকে পড়াইবেন।
মাধবন: বড়মামা যদি না পড়ান?
পার্বতী আম্মা: পড়িবার দরকার নাই।
মাধবন: ইহাতে আমি সম্মত হইব না।
পার্বতী আম্মা: বাটিটা এদিকে দাও; আমি যাই। খাইতে শীঘ্র আসিও।
End of Chapter 1
Get notified when the full Indulekha novel lands — across every language.